শিশুর শৈশব কেমন হওয়া উচিত?
জান্নাতুল নাঈম নোভা :
স্কুলে যাওয়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলার কথা, জন্মদিনে পরিবারের ভালোবাসা পাওয়ার কথা। পৃথিবীকে চেনার কথা কৌতূহল নিয়ে। কিন্তু মোবাশ্বিরা খানম রাথীর শৈশবের গল্পটি সেই স্বাভাবিক ছবির মতো নয়।
রাথীর জন্ম ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, যখন তার মা কামরুন নাহার মণি নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় কারাগারে ছিলেন। জন্মের মাত্র দুই দিন পর থেকেই মায়ের সঙ্গে কারাগারে তার বেড়ে ওঠা শুরু হয়। ২০২৬ সালের ২৪ আগস্ট হাইকোর্টের রায়ে মণিসহ ১০ আসামি খালাস পাওয়ার পর মা-মেয়ে কারাগার থেকে বের হন।
অর্থাৎ, রাথীর জীবনের প্রথম কয়েকটি বছর কেটেছে এমন একটি পরিবেশে, যা কোনো শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার জায়গা হওয়ার কথা নয়।
একটি শিশুর নিজের কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না
নুসরাত হত্যা মামলাটি বাংলাদেশের বহুল আলোচিত একটি মামলা। ২০১৯ সালের অক্টোবরে বিচারিক আদালত মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৬ সালের আগস্টে হাইকোর্ট দুইজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে, চারজনের সাজা যাবজ্জীবনে কমায় এবং ১০ জনকে খালাস দেয়। খালাস পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন কামরুন নাহার মণি।
কিন্তু এই দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে রাথীর কোনো সম্পর্ক ছিল না।
সে কোনো মামলার আসামি ছিল না। কোনো অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ছিল না। তবু মায়ের কারাবাসের বাস্তবতা তার জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
এখানেই রাথীর গল্পটি শুধু একটি পরিবারের গল্প হয়ে থাকে না। এটি হয়ে ওঠে একটি শিশুর অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কারাগারের ভেতর একটি শৈশব
সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রাথীর জন্মের পর থেকেই সে মায়ের সঙ্গে কারাগারে ছিল। কারাগারের পরিবেশেই তার প্রথম কয়েকটি জন্মদিন, ঈদ এবং শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে।
তার বাবা দীর্ঘ সময় মেয়ের কাছ থেকে দূরে ছিলেন। একটি প্রতিবেদনে বাবার বক্তব্য থেকে জানা যায়, নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি মেয়েকে স্বাভাবিকভাবে কাছে পেতেন না। দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার কারণে মেয়েটি একসময় বাবাকে ঠিকমতো চিনবে কি না—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল।
একজন শিশুর জন্য বাবা-মায়ের সঙ্গে নিরাপদ ও স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলা তার বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু রাথীর ক্ষেত্রে সেই সম্পর্কও স্বাভাবিক পথে তৈরি হয়নি।
খেলনা ছিল কল্পনার
কারাগারে থেকেও রাথী যেন একটি শিশুর স্বাভাবিক পৃথিবী তৈরি করতে পারে, সেই চেষ্টা তার মা করেছেন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
কারাগারে পাওয়া সীমিত জিনিস দিয়েই খেলাধুলা ও পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে মণির বক্তব্য হিসেবে এসেছে, তিনি মোজা দিয়ে পুতুল বানিয়ে মেয়েকে খেলতে দিতেন এবং বালিশকে স্কুলব্যাগের মতো ব্যবহার করে পড়াতেন।
এই তথ্যটি একদিকে একজন মায়ের সন্তানের জন্য করা চেষ্টাকে দেখায়, অন্যদিকে আরও বড় একটি প্রশ্নও সামনে আনে।
একটি শিশুর স্বাভাবিক শৈশব কি কেবল একজন মায়ের ব্যক্তিগত চেষ্টার ওপর নির্ভর করবে?
শিশুর অধিকার কি শুধু নিরাপদে বেঁচে থাকা?
শিশুর অধিকার বলতে আমরা প্রায়ই খাবার, পোশাক ও নিরাপত্তার কথা ভাবি। কিন্তু একটি শিশুর পূর্ণ বিকাশের জন্য প্রয়োজন আরও অনেক কিছু—শিক্ষা, খেলাধুলা, পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক, মানসিক নিরাপত্তা এবং নিজের পরিচয় নিয়ে বেড়ে ওঠার সুযোগ।
রাথীর গল্প এই অধিকারগুলোর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
কোনো শিশুর বাবা বা মা আইনি সমস্যায় পড়লে শিশুটির নিজের অধিকার যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়—এটি শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়। সমাজ ও রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে শিশুটিকে তার প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও সুযোগ দেওয়ার।
কারণ বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলেও সন্তান সেই অভিযোগের অংশ নয়।
রায়ের পরে কী?
২০২৬ সালের হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে রাথীর জীবনে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর সে কারাগারের বাইরে একটি ভিন্ন পৃথিবীর মুখোমুখি হয়েছে।
কিন্তু বাইরে আসাই কি সব সমস্যার সমাধান?
সম্ভবত নয়।
কারাগারের পরিবেশ থেকে একটি শিশুকে হঠাৎ স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে ফিরিয়ে আনাও একটি বড় পরিবর্তন। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, নতুন নিয়ম, শিক্ষা ও সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
তাই রাথীর গল্প এখানেই শেষ নয়।
বরং এখান থেকেই শুরু হতে পারে আরেকটি প্রশ্ন—
কারাগারের বাইরে ফিরে আসা একটি শিশুকে আমরা কীভাবে তার হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক শৈশবের সুযোগগুলো ফিরিয়ে দিতে পারি?
রাথির ভবিষ্যৎ যেন মামলার ফাইলে আটকে না থাকে
রাথী কোনো মামলার চরিত্র হওয়ার জন্য জন্মায়নি।
তার পরিচয় শুধু কোনো আসামির মেয়ে হিসেবে হওয়া উচিত নয়। তার নিজেরও একটি ভবিষ্যৎ আছে—নিজের স্বপ্ন, নিজের পছন্দ, নিজের পরিচয়।
হয়তো সে একদিন স্কুলে যাবে। নতুন বন্ধু তৈরি করবে। খেলবে। বই পড়বে। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখবে।
সেই স্বপ্ন দেখার অধিকারটুকু নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নুসরাত হত্যা মামলার বিচার হয়েছে, হচ্ছে এবং আইনি প্রক্রিয়া তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কিন্তু রাথীর জীবনের প্রশ্নটি তার বাইরেও থেকে যায়।
একজন প্রাপ্তবয়স্কের বিরুদ্ধে কোনো মামলা চললে তার প্রভাব যেন একটি নির্দোষ শিশুর পুরো শৈশবকে গ্রাস না করে—এই জায়গাতেই আমাদের শিশু অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
রাথীর গল্প তাই শুধু অতীতের গল্প নয়।
এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি প্রশ্ন—
কোনো শিশুর বাবা-মায়ের পরিচয়, মামলা বা কারাবাস যেন তার নিজের পরিচয় ও ভবিষ্যতের পথে দেয়াল হয়ে না দাঁড়ায়—আমরা কি সেই সমাজ তৈরি করতে পারব?
রাথীর জন্য হয়তো সবচেয়ে বড় ন্যায়বিচার হবে কোনো রায়ের কাগজ নয়।
তার সবচেয়ে বড় অধিকার হবে—
নিজের মতো করে একটি স্বাভাবিক শৈশব ফিরে পাওয়া এবং নিজের স্বপ্নের ভবিষ্যৎ তৈরি করার সুযোগ।
জান্নাতুল নাঈম নোভা
ব্যাচ-৩২, সি.এস.সি
ফেনী ইউনিভার্সিটি