মুহাম্মদ আবদুল্যাহ নয়ন :
বেতন বৈষম্য দূরীকরণ ও নিজেদের পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠাসহ তিন দফা দাবিতে কর্মসূচি নিয়ে আন্দোলনে নামছেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা।
ইতোপূর্বে এসব শিক্ষকরা ১১তম গ্রেডের দাবি জানালেও তা বাস্তবাইয়ন না হওয়ায় এবার সরাসরি দশম গ্রেডের দাবি নিয়ে রাজপথে নামছেন শিক্ষকরা। সহকারী শিক্ষকদের এই দফা দাবী অত্যন্ত যৌক্তিক ও প্রাসঙ্গিক।
এক.
প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের সর্বশেষ নিয়োগ বিধি অনুযায়ী সহকারী শিক্ষকদের নিয়োগ যোগ্যতা স্নাতক দ্বিতীয় শ্রেণির করা হয়েছে এবং শিক্ষগত জীবনে কোন তৃতীয় শ্রেণি গ্রহণযোগ্য নয়। এই সম যোগ্যতা নিয়ে প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য ডিপার্টমেন্টে কর্মরতরা ১০ম গ্রেডে বেতন ভাতা পাচ্ছেন। যেমন-সকরারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক, সাব-ইন্সপেক্টর, নার্স/সিনিয়র নার্স, উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা,ইউনিয়ন পরিষদের সচিব,বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ১০ম গ্রেডে বেতন ভাতা পেয়ে থাকেন। এমনকি একই পাঠ্যবই,একই সিলেবাস,একই বয়সের শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে কাজ করে পিটিআই সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকগণ ১০ম গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন। আর এদের সবার যোগ্যতা স্নাতক। উল্লেখিত যুক্তি গুলো তুলে ধরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয় গত ৭ আগস্ট ২০২৫ খ্রি. ৩৬৪ নং স্মারকে সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল উন্নীত করার জন্য অর্থ মন্ত্রনালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠান। অর্থ মন্ত্রনালয় সেই প্রস্তাব পে-কমিশনে প্রেরণ করে। পে-কমিশনের সাথে সহকারী শিক্ষক সমিতিসহ শিক্ষকদের বিভিন্ন সংগঠন মিটিং করলে সেখানে জানিয়ে দেওয়া হয় বেতন গ্রেড উন্নীত করা পে-কমিশনের কাজ নয়। এটা সার্ভিস কমিশনের কাজ।প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য সরকার গঠিত ৯ সদস্যের একটি কনসালটেশন কমিটি করা হয়েছে, যার আহ্বায়ক হচ্ছেন ব্রাক বিশ্ব বিদ্যালয়ের ইমিরেটস ড. মনজুর আহমদ। তাঁরা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। সেখানে শিক্ষকদেরকে এট্রি পদে ১২ তম গ্রেড ৪ বছর পর ১১ তম গ্রেড দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু আজকে পাঁচ/ছয় মাসে ও সেটার বাস্তবায়ন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অন্তবর্তী কালীন সরকার বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্রাচার্যের নের্তৃত্ব গঠিত জাতীয় শ্বেতপত্র কমিটি তাদের দেওয়া প্রতিবেদনে বলেছেন-শিক্ষকতা এমন একটি পেশা যেখানে মনোযোগ ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে গড়ে তোলা হয়। সেজন্য তাদের বেতন দেওয়ায় কার্পন্য করা যাবে না। এমন কি বেতন কাঠামোর গ্রেড ও অন্য পেশার সঙ্গে তুলনা করা ও বাস্তব সম্মত নয়। শিক্ষকদের স্বাভাবিক জীবনধারা নিশ্চিত করলেই কেবল যথাযথ বুদ্ধিবৃত্তিক আউটপুট পাওয়া সম্ভব। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিন্ম ও এশিয়ার মধ্যে ৪৫ তম। তাই শিক্ষকদের দাবী গুলো দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরী।
দুই.
সরকারী চাকুরীতে কর্মরত কর্মচারীদের অধিকাংশই ব্লক পোস্টে চাকুরী করতে হয়। যদি ও উপরের পোস্টে অনেক ক্ষেত্রে সুপার নিউমারী পদ দিয়ে পদোন্নতি দেওয়ার নিয়ম ও আছে। কিন্তু নিন্মের পোস্ট গুলো বেশীর ভাগই ব্লক হওয়ায় সককার কর্মচারীদেকে পদোন্নতি দিতে না পারলে ও যাতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগস্থ না হয় সেই জন্য ৭ম পে-স্কেল পর্যন্ত ৮/১২/১৫ বছরে তিনটি টাইম স্কেল দিয়ে আসছে। কিন্তু ৮ম পে-স্কেলে তৎকালীন সরকার এই সুবিধাটি বাতিল করে উচ্চতর স্কেল নামে ১০ ও ১৬ বছরে দুইটি স্কেল/গ্রেড সংযুক্ত করে। অর্থাৎ যেখানে পূর্বে ১৫ বছরে ৩ টি স্কেল/গ্রেড উন্নীত হতো ২০১৫ সালের পে-স্কেলে ১৬ বছরে সেটা ২ টা করা হয়েছে। ৮ম পে-স্কেলে এই উচ্চতর স্কেল বা গ্রেডে পাওয়ার ক্ষেত্রে বলা হয়-
উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্যতা; (১) কোন স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ব্যতিরেকে একই পদে ১০ (দশ) বৎসর পূর্তিতে এবং চাকরি সন্তোষজনক হওয়া সাপেক্ষে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১১তম বৎসরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন প্রাপ্য হইবেন।
(২) কোন স্থায়ী কর্মচারী তাহার চাকরির ১০ (দশ) বৎসর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেডে বেতন প্রাপ্তির পর পরবর্তী ৬ (ছয়) বৎসরে পদোন্নতি প্রাপ্ত না হইলে ৭ম বৎসরে চাকরি সন্তোষজনক হওয়া সাপেক্ষে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন প্রাপ্য হইবেন। উচ্চতর গ্রেড পেতে পদোন্নতি ব্যতিরেকে ১০ বছর সময়সীমা লাগে কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেই উচ্চতর স্কেল বা গ্রেড পাচ্ছেন না। ২০০৯ সালের পরে যারা যোগদান করেছেন তাদের কেউ এই উচ্চতর গ্রেড পায়নি। এই ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রনালয় শিক্ষকদের ২০২০ সালের গ্রেড উন্নীত করাকে অযুহাত দেখিয়ে শিক্ষকদেরকে উচ্চতর স্কেল/গ্রেড থেকে বঞ্চিত করছে। অথচ এটা কোন পদোন্নতি নয়। পে-স্কেলে বলা হয়েছে কোন স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ব্যতিরেকে একই পদে ১০ (দশ) বৎসর পূর্তিতে এবং চাকরি সন্তোষজনক হওয়া সাপেক্ষে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১১তম বৎসরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন প্রাপ্য হইবেন। কিন্তু শিক্ষকরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। তারা শিক্ষকদেরকে ২০২০ সালের ১৩তম গ্রেড প্রদানের তারিখ ধরে সাবসটেন্টিভ গ্রেড হিসেবে বিবেচনা করছে। অথচ যে সকল শিক্ষক ৭ম পে-স্কেল অনুযায়ী ১৫ বছরে তিনটা টাইম স্কেল পেয়েছে তারা ১৩তম গ্রেডের সাবসটেন্টিভ গ্রেড ধরে বর্তমানে ১০ম গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন। আবার যারা ২০১৯/২০২০ সালে যোগদান করছেন তাদেরকে ও ১৩ তম গ্রেডের সাবসটেন্টিভ গ্রেড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারী থেকে আবার ১০ বছর গণনা করে শিক্ষকদেরকে উচ্চতর স্কেল/গ্রেড দেওয়া হবে। এই ক্ষেত্রে ২০০৯ সালে যিনি যোগদান করছেন তিনি ও ২০৩০ সালে উচ্চতর স্কেল/গ্রেড পাবে। আবার ২০১৯ সালে যিনি যোগদান করছেন তিনি ও ২০৩০ সালে উচ্চতর স্কেল/গ্রেড পাবে। আবার যারা ৩ টা টাইমস্কেল পেয়েছে তারা ১৩ তমের সুবিধা নিয়ে ১০ম গ্রেডে বেতন পাবে। এখন কনসালটেশন কমিটির সুপারিশ বা শিক্ষকদের দাবীর প্রেক্ষিতে গ্রেড উন্নীত করা হলে এখন থেকে আবার দশ বছর গণনা করে উচ্চতর স্কেল/গ্রেড দেওয়া হবে।